এ.আর.ইমরান
বাংলাদেশে আবারও তীব্র লোডশেডিং। শহর থেকে গ্রাম—দিনের পর দিন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গরমে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ, ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানা, কৃষি ও শিক্ষা কার্যক্রম। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ।
প্রশ্ন হচ্ছে—এত বিদ্যুৎকেন্দ্র, এত উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও কেন এই পরিস্থিতি?
এর সরল উত্তর হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট মূলত উৎপাদনক্ষমতার সংকট নয়; এটি জ্বালানি ও ব্যবস্থাপনার সংকট।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। জুলাইয়ের শেষ দিকেও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমে যাওয়ায় উৎপাদন দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি কমেছিল।
আগস্টে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহে সমস্যা এবং বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ১০ আগস্টের এক প্রতিবেদনে ঘাটতি ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, জ্বালানি নেই
বাংলাদেশ গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়েছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তখন থেকেই রয়ে গেছে—এই কেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কি নিশ্চিত করা হয়েছে?
বাস্তবতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে সেই নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ঘাটতি পূরণে আমদানি করা LNG-এর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার, বৈদেশিক মুদ্রা, আমদানি ব্যয় কিংবা কোনো LNG টার্মিনালে সমস্যা হলেই তার প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়ে।
সম্প্রতি একটি LNG টার্মিনালের দুর্ঘটনার পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়েছে।
অর্থাৎ আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো—বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা সেই অনুপাতে নিশ্চিত করা যায়নি।
শুধু গ্যাসের সংকট নয়
বর্তমান সংকটের জন্য শুধু গ্যাসকে দায়ী করলেও পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রেও জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে চাহিদা বেড়েছে—দুইয়ের ব্যবধানই লোডশেডিং হিসেবে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে এসে পড়েছে।
এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া দরকার—বিদ্যুৎ আমদানিও সবসময় নিরবচ্ছিন্ন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
তাহলে এত টাকা বিনিয়োগের পরও কেন এই দুরবস্থা?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। শুধু নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই সেই লক্ষ্য পূরণ হয় না।
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর সেটি ২০-২৫ বছর চালাতে কী পরিমাণ গ্যাস, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানি প্রয়োজন হবে—তার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।
অন্যথায় কাগজে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে, কিন্তু বাস্তবে কেন্দ্র বসে থাকবে।
আজকের সংকট আমাদের সেই বাস্তবতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কি সমাধান?
গ্যাস না থাকলে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো সম্ভব। কিন্তু সেখানে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছু ঘাটতি পূরণ করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বিদ্যুতের দাম, ভর্তুকি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
অর্থাৎ প্রশ্ন শুধু ‘বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদন করব’—তা নয়।
প্রশ্ন হলো, কত খরচে উৎপাদন করব এবং সেই খরচ দেশের অর্থনীতি কতটা বহন করতে পারবে?
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অতীতে একটি প্রবণতা ছিল—চাহিদা বাড়লে দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। সেই সময় এটি প্রয়োজনীয়ও ছিল। কিন্তু এখন শুধু সক্ষমতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন—
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো;
LNG আমদানির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা;
সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো;
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষতা নিশ্চিত করা;
সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা;
এবং সর্বোপরি বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
দায় কার—এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন, সমাধান কী?
বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হবেই। কে কতটা দায়ী, কোন সরকারের কোন সিদ্ধান্ত ভুল ছিল—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চান।
একজন কৃষক চান সেচের পাম্প চলুক। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চান তাঁর দোকানের ফ্রিজ বা মেশিন বন্ধ না থাকুক। একজন শিক্ষার্থী চান রাতে পড়ার সময় বিদ্যুৎ থাকুক। একজন কারখানা মালিক চান উৎপাদন বন্ধ না হোক।
বিদ্যুৎ সংকট তাই শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি ও জনজীবনের সমস্যা।
এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন জ্বালানি নিরাপত্তা। আর জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন বহুমুখী উৎস, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা, আর্থিক সক্ষমতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশ যদি শুধু সংকট দেখা দিলে তেল কিনে, LNG এনে বা সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ আমদানি করে সমস্যার সমাধান করতে চায়, তাহলে লোডশেডিং বারবার ফিরে আসবে।
আজকের অন্ধকার তাই শুধু একটি দিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট নয়।
এটি আমাদের জ্বালানি পরিকল্পনার দুর্বলতার একটি সতর্কবার্তা।
বিদ্যুৎকেন্দ্র আরও কত হবে—তার চেয়ে এখন বেশি জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত: সেই কেন্দ্রগুলো আগামী ২০ বছর কীভাবে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানিতে চলবে?
এই প্রশ্নের টেকসই উত্তর দিতে না পারলে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যান যতই বাড়ুক—সাধারণ মানুষের ঘর অন্ধকার হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।